ঝিনুক চাষ , মৎস্য খাতের প্রযুক্তি ,

স্বাদুপানিতে মুক্তা চাষ

MD NAYEM HOSSAIN | ২৫ আগষ্ট ২০২৫

স্বাদুপানিতে/পুকুরে মুক্তা চাষ

বাংলাদেশে স্বাদুপানিতে মুক্তা চাষ: মুক্তা একটি মূল্যবান রত্ন। মুক্তা সৌখিনতা ও আভিজাত্যের প্রতীক। প্রাচীনকালে মুক্তার উৎপাদন কৌশল জানা ছিল না। তখন শুধু প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মুক্তাই সংগ্রহ করা হতো। পরবর্তী সময়ে চীন এবং জাপান প্রধান মুক্তা উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। ভারতেও এর মধ্যে মুক্তাচাষ করে সাফল্য অর্জন করেছে। প্রায় ২৫০০ বছর আগে থেকে বাংলাদেশে মুক্তার ব্যবহার চলে আসছে বলে তথ্য পাওয়া যায়।

 

বাংলাদেশের মিঠাপানির জলাশয় মুক্তাবহনকারী ঝিনুকে পরিপূর্ণ। বাংলাদেশের জলবায়ু মুক্তাচাষের উপযোগী। প্রায় ১০ মাস উষ্ণ আবহাওয়া থাকায় ঝিনুকের বৃদ্ধি ও মুক্তাচাষের পরিবেশ ও অনুকূল এখানে। আন্তর্জাতিক বাজারে মুক্তার চাহিদা যেমন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনিভাবে অভ্যন্তরীণ বাজারেও মুক্তার চাহিদা উল্লেখযোগ্য। এসব বিষয় বিবেচনায় ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট স্বাদুপানিতে মুক্তা চাষের পরীক্ষামূলক গবেষণা শুরু করে এবং উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাদু পানিতে মুক্তা চাষ করে সাফল্য অর্জন করেছে।

খাদ্য: ঝিনুক অমেরুদন্ডী জলজ প্রাণী। এরা ফিল্টার ফিডার বা ছাঁকনভোজী। অর্থাৎ এরা পানিতে ছাঁকন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক খাদ্য সংগ্রহ করে। অল্প বয়স্ক ঝিনুক পানিতে ভাসমান শেওলা অর্থাৎ এককোষী অ্যালজি; যেমন-ডায়াটম, গোল্ড অ্যালজি, গ্রিন অ্যালজি, ইউল্লেনা ইত্যাদি ছাঁকন প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করে খায়। প্রাপ্ত বয়স্ক ঝিনুক এককোষী অ্যালজি ছাড়াও কলোনিবদ্ধ অ্যালজি, জৈব পদার্থ, ছোট জুপ্লাংকটন ইত্যাদি খায়।

ঝিনুকের জীবন চক্র: ঝিনুকের জীবনচক্র বেশ জটিল। বিএফআরআই গবেষণার মাধ্যমে দেখতে পায় যে, ঝিনুক কমবেশি সারা বছরই প্রজনন করে থাকে। তবে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাস ঝিনুকের সর্বোচ্চ প্রজননের সময়। এ সময় পুরুষ ও স্ত্রী ঝিনুক প্রজনন ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়। পুরুষ ঝিনুক শুক্ররস নিঃসৃত করে। শুক্ররস স্ত্রী ঝিনুকের দেহে ঢুকে ডিমকে নিষিক্ত করে। এভাবে নিষিক্ত ডিম ফুলকার সাথে লেগে থাকে এবং বৃদ্ধি পেয়ে লার্ভায় পরিণত হয় যাকে গ্লোচিডিয়া বলা হয়। গ্রোচিডিয়া যখন স্ত্রী ঝিনুকের দেহ থেকে বের হয়ে আসে তখন অবশ্যই একটি পোষক মাছের (রাজপুটি, টাকি, শিং, পাবদা, গুলসা ও তেলাপিয়া ইত্যাদি) সংস্পর্শে আসে এবং পরজীবী হিসেবে ফুলকা, পাখনা বা দেহের সাথে লেগে থাকে। কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ এভাবে লেগে থাকার পর গ্লোডিডিয়া পোষক মাছের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পুকুরের তলায় চলে যায় এবং তরুণ ঝিনুক হিসেবে জীবন শুরু করে। পূর্ণাঙ্গ হয়ে প্রজনন শুরু করতে ঝিনুকের (১-১.৫) বছর সময় লাগে।

বাংলাদেশে মুক্তা উৎপাদনকারী ঝিনুকের কলাকৌশল:

মুক্তা তৈরি করতে পারে এমন ৭টি প্রজাতির ঝিনুক বাংলাদেশে শনাক্ত করা হয়েছে। এই ৭টি প্রজাতি হলো:

ল্যামেলিডেনস মারজিনালিস (Lomellidens marginalis);

ল্যামেলিডেনস করিয়ানাস (Lamellidens corrianus),

ল্যামেলিডেনস ফেঞ্চুগ্যানজেনসিস (Lamellidens phenchonganjensis),

ল্যামেলিডেনস জেনকিনসিয়ানাস (Lamellidens jenkinsianus),

পরিসিয়া করুগাটা (Parreysia corrugata);

এনোডোন্টা সিগনিয়া (Anodonta Cygnea),

পিসবিরোকঙ্কা এক্সিলিস (Plisbryoconcha exilis);

স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য ঝিনুক হতে তিনটি পদ্ধতিতে মুক্তা উৎপাদন করা যায়:

১. ম্যান্টল টিস্যু অপারেশন পদ্ধতি:

এই অপারেশন দুটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়। প্রথমে ম্যান্টল টিস্যুর টুকরা তৈরি কর। হত তারপর ঝিনুকে প্রতিস্থাপিত করা হয়। এক্ষেত্রে অপারেশনের জন্য ১-২ বৎসর বয়সের ঝিনুক (৬-৮) সে.মি, স্বাস্থ্যবান এবং শক্ত ঝিনুকের ম্যান্টল টিস্যুও কিনারার দিক থেকে টিস্যু সংগ্রহ করতে হবে। টিস্যু সংগ্রহের সময় ঝিনুকটি সম্পূর্ণ খুলে বা ফাঁকা করে কেটে বিচ্ছিন্ন করতে হবে।

এভাবে বিচ্ছিন্ন করা টিস্যু একটি প্লাস বোর্ডে/কাঠের বোর্ডে রেখে ছোট ছোট টুকরা করে কাটতে হবে। প্রতিস্থাপনের জন্য অপর একটি শক্ত স্বাস্থ্যবান ও প্রশস্ত ঝিনুকের দুটি খোলস (৮-১০) মি.মি. পর্যন্ত ফাঁক করতে হবে। দুই খোলসের মাঝে কাঠের কীলগ/স্টেপল স্থাপন করতে হবে যাতে খোলস দুটি বন্ধ হয়ে না যায়। ঝিনুকের পেছন দিকের মাংশল ম্যান্টলের বহিঃপ্রান্তে টিস্যু প্রতিস্থাপন করা ভালো। প্রতিস্থাপনের জন্য প্রথমেই হুক এবং নিডল এর সাহায্যে এক টুকরা ম্যান্টল টিস্যু নিতে হবে। উলম্বভাবে ঝিনুকের ম্যান্টলে একটি গর্ত করে তাতে টুকরাটি স্থাপন করতে হবে। এভাবে পেছন থেকে সামনের দিকে একের পর এক টুকরা ম্যান্টল টিস্যু স্থাপন করতে হবে। ঝিনুকের আকার ও স্বাস্থ্য অনুযায়ী যে কয়টি টুকরা প্রতিস্থাপন করা যায় ততটি মুক্তা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২. নিউক্লিয়াস অপারেশন পদ্ধতি: এই প্রক্রিয়ায় একটি নিউক্লিয়াস; যেমন-ছোট পুতি, ছোট মুক্তা ইত্যাদির সাথে একটি ম্যান্টল টিস্যুর টুকরা সংলগ্ন অবস্থায় প্রবেশ করাতে হবে। এক্ষেত্রে ঝিনুকের তিনটি স্থান; যেমন-পিছনের দিক যেখানে ম্যান্টল বেশ পুরু, পরিপাকতন্ত্রে ও উপরিভাগে এবং পায়ের মাংসে নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন করতে হবে। প্রতিস্থাপনের জন্য একটি ধারালো সুচের সাহায্যে ঝিনুকের দেহে একটি ছোট গর্ত তৈরি করে তাতে নিউক্লিয়াসটি স্থাপন করতে হবে। নিউক্লিয়াসের গায়ে একটি ম্যান্টলের টুকরা স্থাপন করার পর গর্তের মুখ বন্ধ করে দিতে হবে।

৩. ইমেজ মুক্তা অপারেশন পদ্ধতি:

মুক্তা ইমেজ আকারেও উৎপাদন করা সম্ভব। কোন মানুষ, প্রাণী বা বস্তুর ইমেজ আকারে মুক্তা উৎপাদন করা সম্ভব। মোম, ঝিনুকের খোলস, ঝিনুকের খোলসের গুড়া, এক্রিলিক পাউডার ইত্যাদি পদার্থ দিয়ে ইমেজ তৈরি করা যেতে পারে।

  • ইমেজগুলোকে পানিতে ভেজাতে হবে।
  • ঝিনুকের খোলস ০৮-১০ মি.মি. খুলতে হবে এবং কাঁদা ও বালি ইত্যাদি পরিষ্কার করতে হবে।
  • একটি পাতলা পাত দিয়ে খোলসের কিছু অংশ থেকে ম্যান্টল আলাদা করতে হবে।
  • সাবধানতার সাথে ইমেজ ঢুকিয়ে ম্যান্টল গর্ত থেকে বাতাস ও পানি বের করে দিতে হবে।

অপারেশনকৃত ঝিনুকের চাষ:

অপারেশনকৃত ঝিনুক ২-৩ বছর পানিতে চাষ করার পর তাতে মুক্তা তৈরি হয়। পুকুর, নদী, হ্রদে যাতে পরিবেশ ভালো থাকে, দূষণ বা রোগের প্রাদুর্ভাব নেই এমন জলাশয় মুক্তা চাষের উপযোগী। রাইস মুক্তা উৎপাদন হতে ন্যূনতম ২.৫-৩ বছর, নিউক্লি মুক্তা উৎপাদনে ১.৫-২ বছর এবং ইমেজ মুক্তা উৎপাদনে ১১ মাস সময় প্রয়োজন। মুক্তা চাষের পুকুরে রুই, কাতলা ও মৃগেল চাষ করা যাবে; তবে সিলভার কার্প বা কোনো রাক্ষুসে মাছ চাষ করা যাবে না। এছাড়া নদীর কূলবর্তী এলাকা যেখানে পানির প্রবাহ থাকে সেখানে মুক্তা চাষ করা যায়। পুকুরে সামান্য পানি প্রবাহ সৃষ্টি করা গেলে ভালো। মুক্তা চাষের জলাশয়ে প্রতি মাসে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। ঝিনুকের বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ করা প্রয়োজন। জলাশয়ের পানির রং হলুদাভ সবুজ এবং স্বচ্ছতা ৩০ সে.মি. ঝিনুক চাষের জন্য উপযোগী। এরূপ রং না থাকলে সেখানে দৈনিক (২০০-৩০০) গ্রাম গোবর, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১২৫ গ্রাম টিএসপি প্রয়োগ করতে হবে।

অপারেশনকৃত ঝিনুক চাষের জন্য জলাশয়:

পুকুর, নদী, হ্রদ এবং অন্যান্য জলাশয় যাতে দূষণ বা রোগের প্রাদুর্ভাব নেই এমন জলাশয় মুক্তা চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে।

জলাশয়ে ঝিনুক স্থাপন:

উপরোল্লিখিত পরিবেশে পুকুরে বা নদীতে অপারেশনকৃত ঝিনুক স্থাপন করার জন্য আড়াআড়িভাবে পুকুরে নাইলনের মোটা রশি টানাতে হবে। রশির দুষ্ট প্রতিটি নেট খুটির সাথে বেঁধে রশিটিকে ভাসমান রাখতে হবে।

পুকুর:

মুক্তা চাষের জন্য পুকুরই সবচেয়ে ভালো এবং সহজে ব্যবস্থাপনা করা আয়তন ১৫-৩০ শতাংশ বা তার চেয়েও বড় হতে পারে। পানির গতীয়ব ফুট। পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সার প্রয়োগ করতে হবে। মুক্তা চাষে প্রচলিত নিয়মে তৃণভোজী মাছ; যেমন-রুই, কাতলা, মৃগেল, গ্রাসকার্প ও বিগহেড জাপ ইত্যাদি চাষ করা যাবে। তবে সিলভার কার্প বা রাক্ষুসে মাছ চাষ করা যাবে না।

উন্মুক্ত জলাশয়:

উন্মুক্ত জলাশয়; যেমন-নদী ও হ্রদ ইত্যাদিতেও মুক্তা চাষ করা যায়। নদীর কূলবর্তী এলাকা এজন্যে নির্বাচন করা যায়। এসব এলাকায় স্রোত কম থাকে এবং বেশি অক্সিজেন থাকে যা মুক্তা উৎপাদনের জন্য সহায়ক।

চাষের পরিবেশ:

চাষের পরিবেশের সাথে ঝিনুকের বৃদ্ধি এবং মুক্তা উৎপাদন সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এজন্য মুক্তা চাষে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভের জন্য চাষের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।

পানির গভীরতা:

মুক্তা চাষের জন্য পুকুরের পানির গভীরতা ৫-৭ ফুট (১.৫-২.৫ মিটার) হলে ভালো হয়। গভীরতা এর কম বা বেশি হলে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখা যায় না।

পানির প্রবাহ:

পুকুরের পানিতে সামান্য প্রবাহ সৃষ্টি করা গেলে ঝিনুকের বৃদ্ধিসাধনে এবং মুক্তা উৎপাদনে সহায়ক হয়। তাই সম্ভব হলে প্যাডেল হুইল ব্যবহার করে সামান্য প্রবাহের ব্যবস্থা করা যায়। তাছাড়া মাসে একবার পুকুরের কিছু পরিমাণ পানি পরিবর্তন করলে ভালো হয়।

পানির পিএইচ বা ক্ষারত্ব:

ঝিনুকের বৃদ্ধির জন্য পানির অনুকূল পিএইচ হলো ৭ থেকে ৮। অম্লীয় (পিএইচ ৬.৫ এর চেয়ে কম) অথবা ক্ষারীয় (পিএইচ ৮.৫ এর চেয়ে বেশি) পিএইচ ঝিনুকের বৃদ্ধি এবং মুক্তা উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত নয়। পুকুরের পানির পিএইচ কমে গেলে শতাংশে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে।

পুষ্টি পদার্থ:

ক্যালসিয়াম মুক্তা উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। ঝিনুকের খোলস এবং মুক্তার প্রধান উপাদান হলো ক্যালসিয়াম। পানিতে ক্যালসিয়াম যাতে প্রতি লিটারে ১০ মিলিগ্রাম এর চেয়ে বেশি থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এজন্য প্রতি মাসে শতাংশে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। অন্যান্য ক্যালসিয়াম সার; যেমন-কলি চুন বা পোড়া চুনও প্রয়োগ করা যায়। ঝিনুক এবং অন্যান্য জলজ জীবের জন্য ম্যাগনেসিয়াম, সিলিকা, ম্যাংগানিজ এবং লৌহ প্রয়োজন। জৈব এবং অজৈব সার প্রয়োগের মাধ্যমে পানিতে দরকারি খাদ্যের পরিমাণ বাড়াতে হবে।

প্রাকৃতিক খাদ্য:

ঝিনুকের খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া মূলত পরোক্ষ। ফুলকার মাধ্যমে এরা পানিতে বিদ্যমান অ্যালজি, ক্ষুদ্রাকার জুপ্লাংকটন, অণুজীব অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি জৈব দ্রব্য ছেঁকে ছেঁকে খায়। তাই পুকুরে যথেষ্ট পরিমাণ প্রাকৃতিক খাদ্য বিদ্যমান রাখার জন্য নিয়মমাফিক সার প্রয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঝিনুক চাষের জন্য পানির রং হবে হলুদাভ সবুজ এবং স্বচ্ছতা ৩০ সে.মি.।

জৈব সার ১ কেজি

ইউরিয়া ০.১ কেজি

টিএসপি ০.১২৫ কেজি

চুন ০.৫ কেজি

জীবিত ঝিনুক থেকে মুক্তা সংগ্রহ:

ঝিনুক খোলার চিমটা দিয়ে ঝিনুকের খোলস খুব সাবধানতার সাথে সামান্য ফাঁক করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যাতে সংযোজন পেশি (যে পেশি ঝিনুকের দুটি খোলসকে আটকিয়ে রাখে) ছিড়ে না যায়। মুক্তার থলি থেকে বাইরের দিকে একটি পাতলা পাতের সাহায্যে সামান্য চাপ দিয়ে মুক্তা বের করে আনতে হবে। মুক্তা সংগ্রহ শেষে ঝিনুক আবার পালন করা যেতে পারে এবং তা মুক্তাচাষে ব্যবহার করা যায়। তবে এ পদ্ধতি শুধুমাত্র রাইস মুক্তা ও নিউক্লি মুক্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইমেজ মুক্তা সংগ্রহ করতে ঝিনুককে সম্পূর্ণরূপে কেটে সংগ্রহ করতে হয়।

চাষের পুকুরে ঝিনুক স্থাপন:

  • ঝিনুক রাখার জন্য আড়াআড়ি ভাবে পুকুরে নাইলনের মোটা রশি টানতে হবে। রশির দুই প্রান্ত বাঁশের খুঁটির সাথে বাঁধতে হবে।
  • পরিমাণমত ফ্লোট বা ভাসান যুক্ত করে রশিটিকে ভাসমান রাখতে হবে।
  • ঝিনুক নেটের ব্যাগে রেখে তা রশি থেকে নাইলন সুতা দিয়ে এমনভাবে ঝুলিয়ে দিতে হবে যেন নেট ব্যাগে স্থাপিত ঝিনুক ১.০-১.৫ ফুট পানির নীচে অবস্থান করে।
  • প্রতিটি নেট ব্যাগে ২-৩ টি করে ঝিনুক রাখতে হবে।

ঝিনুক কেটে মুক্তা সংগ্রহ:

  • ঝিনুকের দেহ থেকে ম্যান্টল আলাদা করে নিতে হবে।
  • ম্যান্টলগুলো তোয়ালের সাহায্যে ঘষতে হবে। এতে ম্যান্টল থেকে মুক্তা পৃথক হয়ে যাবে।
  • ম্যান্টল টিস্যু ধুয়ে ফেলে দিলে পাত্রের তলায় মুক্তা জমা হবে।
  • এইভাবে কয়েকবার তোয়ালে দিয়ে ঘষলে ম্যান্টল থেকে মুক্তা পুরোপুরি পৃথক হয়ে যাবে।
  • মুক্তা থেকে আঠা জাতীয় পদার্থ দূর করার জন্য ঘন লবণ পানিতে ৫ থেকে ১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে।
  • লবণ পানি দূর করার জন্য মুক্তা পুনরায় কয়েকবার পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।

আয়:

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, একটি ঝিনুকে (১০-১২) টি মুক্তা জন্মে। প্রতিটি মুক্তার খুচরা মূল্য ৫০ টাকা। প্রতি শতাংশে ৬০ থেকে ১০০টি ঝিনুক চাষ করা যায়। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতি শতাংশে ৮০টি ঝিনুকে গড়ে ১০টি করে ৮০০ মুক্তা পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য ৪০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে প্রতি একরে ৪০ লাখ টাকার মুক্তা উৎপাদন করা সম্ভব।

উপসংহার:

বাংলাদেশে প্রচুর পুকুর-দিঘী, খাল-বিল, হাওর-বাওড় ও নদী-নালা আছে যা মুক্তাচাষের জন্য উপযুক্ত। মুক্তা চাষ মাছের ক্ষতি করে না বিধায় পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফসল হিসেবে মূল্যবান মুক্তা চাষ করে বাড়তি আয় করা যায়। তাছাড়া মুক্তা উৎপাদনের জন্য চাষকৃত ঝিনুক ছাঁকন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুকুরের পরিবেশ উন্নত করে। মুক্তা চাষ ব্যয়বহুল বা কঠিন বিষয় নয়। এক্ষেত্রে বড় পুঁজি হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও শ্রম। দেশের নারী সমাজ যদি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেন তবে মুক্তা চাষে বিরাট সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে এবং ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর বিএফডিসি ভবন, ২৩-২৪ কারওয়ান বাজার,